বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জলবায়ু সহনশীল সবুজ অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই বায়োইকোনমি (জৈব-অর্থনীতি) বিকাশে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত ও সুদৃঢ় আঞ্চলিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।
বুধবার (১ জুলাই) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইউএনইএসক্যাপ) ‘কমিটি অন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’-এর নবম অধিবেশনের মন্ত্রী পর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান।
বায়োইকোনমি বা জৈব-অর্থনীত' বলতে এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বোঝায়, যা নবায়নযোগ্য জৈবিক সম্পদ (যেমন: উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীব এবং বর্জ্য বা বায়োমাস) ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব উপায়ে খাদ্য, শক্তি, পণ্য ও বিভিন্ন সেবা উৎপাদন করে। এটি জীবাশ্ম জ্বালানি (যেমন: কয়লা, পেট্রোলিয়াম) এবং ক্ষতিকারক রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও জৈবিক উপাদানভিত্তিক একটি টেকসই অর্থনৈতিক মডেল।
অধিবেশন চলাকালে ইউএনইএসক্যাপের ডেপুটি এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি লিন ইয়াংয়ের এক প্রশ্নের জবাবে পরিবেশমন্ত্রী বাংলাদেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং এ বিষয়ে জাতীয় ও আঞ্চলিক উদ্যোগের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক বায়োইকোনমির বাজার বর্তমানে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৭ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে অবশ্যই পরিবেশবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে, যাতে কৃষক, জেলে, নারী এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত হয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ দেশ হওয়ায় প্রতিনিয়ত বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও তীব্র তাপদাহের মতো জলবায়ুজনিত সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি জানান, ২০২৪ সালে তীব্র তাপদাহের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ১৭৮ কোটি ডলার সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এবং প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবেশ সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে টেকসই বায়োইকোনমি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
একই দিনে ব্যাংককের জাতিসংঘ সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ সরকার, ইউএনইএসক্যাপ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), এশিয়ান ডিজাস্টার প্রিপেয়ার্ডনেস সেন্টার (এডিপিসি) এবং জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত আরেকটি আলোচনা সভায় আবদুল আউয়াল মিন্টু বাংলাদেশের সবুজ অর্থনীতিতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সোনালি আঁশ পাট ঐতিহ্যবাহী চটের বস্তার গণ্ডি পেরিয়ে এখন উচ্চমূল্যের বহুমুখী সবুজ পণ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে। পাশাপাশি প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব ‘সোনালি ব্যাগ’ উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি সফল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
মন্ত্রী বলেন, দেশের গ্রামীণ জ্বালানি সংকট নিরসন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বায়োগ্যাস এবং উন্নত চুল্লি কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি দুর্গম উপকূলীয় এলাকায় ৪১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি সোলার হোম সিস্টেম স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের কাছে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
তিনি ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্বের বৃহত্তম একক ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলতে ব্লু-বায়োইকোনমি ও ম্যানগ্রোভ বনায়নের গুরুত্বও তুলে ধরেন।
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার ও নীতিগত অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ৩ আর (রিডিউস, রিইউজ ও রিসাইকেল) পদ্ধতি ও সার্কুলার ফিউচার মডেলের মাধ্যমে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।